Posts

রবীন্দ্র-আলোকে ললিত ভারতী—সমীপেষু দাস

Image
  রবীন্দ্র-আলোকে ললিত ভারতী কাব্যসরস্বতী কোনো মন্দিরের বন্দিনী দেবতা নন                                                                                                       ( মধুমঞ্জরি, বনবাণী )                        রবীন্দ্রনাথ কাব্য ও সংগীতকে কখনওই পৃথক ব’লে ভাবতেন না। প্রথম জীবনের তাঁর কাব্যগুলির নামকরণ-ই তার যথাযথ প্রমাণ – সন্ধ্যাসংগীত, প্রভাতসংগীত, ছবি ও গান, কড়ি ও কোমল  ইত্যাদি। এমনকি যে কাব্যের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান; তা-ও গীতাঞ্জলি। তাঁর রচিত অসংখ্য কবিতা-ই গানের রূপ পেয়েছে। ব্যক্তিজীবনে তিনি তাঁর কাব্যরচনার প্রেয়সীরূপে পেয়েছিলেন তাঁর ‘নতুন বৌঠান’ তথা কাদম্বরী দেবী-কে। তিনি যখন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে আসেন; তখন বয়সে তিনি বালিকা। তাই সেই ছবিই পরবর্তীত...

কালীকথা-২—ধ্যানালোকে দক্ষিণা কালী—ভাস্বর নন্দী

Image
  ধ‍্যানালোকে দক্ষিণা কালী — ভাস্বর নন্দী  মলিকিউলার বায়োলজি গবেষক   যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়  আধ্যাত্মিক পটভূমিতে শ্রী শ্রী কালীর ভূমিকা অপরিসীম। বিষ্ণুক্রান্তার অন্তর্গত বঙ্গদেশ কালীকূলের অন্তর্ভুক্ত এবং জগদম্বা কালী অর্থাৎ প্রথমামহাবিদ্যা দেবীই প্রধান উপাস্যা। জগদম্বিকা কালী স্বয়ং বিশ্বব্রহ্মান্ড প্রসবিনী, জগৎপালিকা এবং সৃষ্টিসংহারনায়িকা। তিনি জগৎপরিব্যাপ্তা, অচিন্তনীয়, জগন্মোহিনী মহামায়া। তাঁর স্বরূপ স্বয়ং ভগবানও উপলব্ধি করতে পারেন না। বিখ্যাত এক কালিকীর্তনে পাই "কালী নামের এতো গুণ, কেবা জানতে পারে তায়, কিঞ্চিৎ জানিয়া শিব তাই পড়েছে রাঙা পায়"। অর্থাৎ সর্বেশ্বর দেবাদিদেব কৌলেশ্বর মহাদেবও মহাকালীর স্বরূপ সম্পর্কে কিঞ্চিৎমাত্র অবগত এবং তাতেই তিনি দেবীর রাতুলচরণে আশ্রয় নিয়েছেন। জ্ঞানবুদ্ধি আশ্রয় করেও আমরা নিমিত্ত মাত্র মানুষ যেটুকু বুঝতে পারি তা কেবল এই সংসারেই সীমাবদ্ধ। চরাচরাধিষ্ঠাত্রী জগন্মাতাকে বোঝার ক্ষমতা আমাদের নেই। যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁর সাধনজীবনের সর্বানুভূতির তত্ত্বকে একাত্মিভূত করে বলেছেন " যিনি ব্রহ্ম তিনিই শক্তি" অর্থাৎ ব্রহ্ম ও ...

কালীকথা-১—বিদ্যাসুন্দর কাব্যে কালী : এক অনন্য ভূমিকায়—উৎসব চৌধুরী

Image
  বিদ্যাসুন্দর কাব্যে কালী : এক অনন্য ভূমিকায় — উৎসব চৌধুরী গবেষক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় অন্নদামঙ্গলের কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র। নিজের কবিসত্তার প্রতি তাঁর প্রত্যয় গভীর, তাই তিনি অনায়াসে বলতে পারেন “ভারত ভারত-খ্যাত আপনার গুণে”। আজ ভারতচন্দ্রের কাব্য নিয়ে একটু কথাবার্তা হোক। ভারতচন্দ্রের কাব্যের দ্বিতীয় খণ্ড বিদ্যাসুন্দর ওরফে কালিকামঙ্গল। উচ্ছ্বসিত আদিরসের কারণে এ খণ্ড বিপুলভাবে লোকপ্রিয়। দেবীর পারম্যবিবৃতি এই কাব্যখণ্ডের লক্ষ্য নয়, তা পূর্বখণ্ডেই প্রতিষ্ঠিত। মঙ্গলদেবীরূপে দেবীর পূজাপ্রতিষ্ঠাও এখানে লক্ষ্য নয়, দেবী ইতোমধ্যেই বঙ্গীয় জনসমাজে সুপূজিত। দেবীর ভূমিকা এখানেই নিতান্তই ব্যতিক্রমী,এখানে কালী নায়ক-নায়িকার ইষ্টদেবী, তাঁদের মিলনের সহায়ক। ভারতচন্দ্র বহুবার নিজের কবিকৃতিকে ‘নূতন মঙ্গল’ বলেছেন। প্রচলিত মঙ্গলকাব্যধারার ছাঁচ অনুসরণ করলেও রচনার বহু স্থানে তাঁর ভাবনার নূতনত্ব, তাঁর স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা প্রকট।  আজ, বিদ্যাসুন্দর নিয়ে কয়েকটা কথা বলা যাক। পূর্ণাঙ্গ আলোচনা নয়, টুকরো টুকরো  ছবি।   . * * কাব্যের প্রথম খণ্ডে প্রচলিত হর-পার্বতী কাহিনীকে কবি নান...

মাতৃরূপেণ—১৮, বিসর্জনে বিজয়া—সমীপেষু দাস

Image
  বিসর্জনে বিজয়া বাংলার উৎসবের গান এক বিশেষ জায়গা নিয়ে রয়েছে। বাঙালির জাতীয় উৎসব দুর্গাপুজোকে ঘিরেও এক ধরণের গান প্রচলিত রয়েছে। এই চারদিনের দুর্গাপুজোর প্রতিদিনেরই মেজাজ একেক রকম। একেবারে মহালয়ার দিন ভোরে দেবীর চোখ আঁকার সাথে সাথেই ‘পুজো পুজো গন্ধ’ ছড়িয়ে পড়া আর প্রতিদিনের ব্যস্ততা থেকে একটু ছুটি খোঁজা, ষষ্ঠীতে বোধনের সময় মাঙ্গলিক আচার, সপ্তমীতে নবপত্রিকার স্নানে একজোট হয়ে দোলা নিয়ে নদীতে বা স্থানীয় জলাশয়ে যাওয়া, অষ্টমীতে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার সময় মাঞ্জা দিয়ে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা বা বাহারি পঞ্চব্যঞ্জন পদ সাজিয়ে লুচি খাওয়া, সন্ধিপুজোয় আবার প্রদীপের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠা,নবমীতে প্রসাদ পাওয়া এবং অবশেষে দশমীতে ঘটবিজয়া ও মূর্তিবিসর্জনে বিষাদের পরিবেশ।   তবুও আনন্দপ্রিয় বাঙালি এই দিনেও বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের পালনের মধ্যে দিয়েই আশায় বুক বাঁধে। এই আসা-যাওয়াকে কেন্দ্র ক’রেই বেশ কিছু গান রয়েছে। মূলতঃ রামপ্রসাদ সেনের আগমনী গান বেশি জনপ্রিয় হলেও বেশ কিছু বিজয়া পর্যায়ের গানও রয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে সাধক কমলাকান্ত ভট্টাচার্য, পাঁচালিকার দাশরথি রায়, কবি মধুসূদন সকলেই বিজয়ার গান লিখেছ...

মাতৃরূপেণ—১৭, "সুবর্ণ গোলক"-এ প্রতিফলিত চিন্তার সেকাল এবং একাল—শাল্মলী রায়

Image
  "সুবর্ণ গোলক"-এ প্রতিফলিত চিন্তার সেকাল এবং একাল —শাল্মলী রায়  শিক্ষিকা, স্বাধীন গবেষক,  সম্পাদক—স্টুডিয়ো 15। সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই শেষ দুদিনের সবচেয়ে চর্চিত বিষয় বলে মনে করতে গেলেই মনে পড়বে একটি বিশেষ অলঙ্কার প্রস্তুতকারী সংস্থার একটি বিশেষ বিজ্ঞাপনের কথা, যেখানে দুটি ভিন্ন সম্প্রদায়ের পরিবারের এবং সংস্কৃতির মিলন দেখানো হয়েছে। বিজ্ঞাপনটি যথেষ্ট প্রশংসা পেলেও কোথাও তা বিশেষ আঘাত করেছে কিছু বিভাজ্যবাদীকে যারা আসলে মিলনের বদলে বিভাজন এবং একতার বদলে একক হওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।   ঠিক এখানেই একটি প্রশ্ন উঠে এসেছে যেটা বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রশ্নটি যোগ্যতার এবং অবশ্যই যোগ্যতা নির্ণয়ের মাপকাঠিকে ঘিরে। একটা মানুষের অধিকার, তার ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিধি ঠিক কতখানি হলে তা অপর কাউকে আঘাত করে না সেটা যেমন এক্ষেত্রে ভাবতে হয়, ঠিক তেমনি ভাবতে হয়, কোন পরিস্থিতিতে ক্ষমতা আর তার অপব্যবহারের মধ্যে থাকা সূক্ষ্ম ব্যবধানটি ঘুচে পরিস্থিতি অসহনীয় করে তোলে। আর এই পরিস্থিতি অসহনীয় হতে হতেই একটি সময় আসে যখন প্রতিবাদ করাটা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। অথচ ...

মাতৃরূপেণ—১৬, মা আসছেন—পণ্ডিতপ্রবর গোরাচাঁদ ভট্টাচার্য

Image
  মা আসছেন —পণ্ডিতপ্রবর গোরাচাঁদ ভট্টাচার্য ('ভাগবতরত্ন') শ্রীধাম নবদ্বীপ। নদীয়া। ভারতবর্ষের শক্তি আরাধনা বহু প্রাচীন। আচার্য শংকর যে কয়খানি উপনিষদের টীকা লিখেছিলেন, তার মধ্যে 'কেনোপনিষদ' অন্যতম। 'কেন' অর্থাৎ কাহার দ্বারা? এই প্রশ্নে গুরু-শিষ্য সংবাদে উক্ত উপনিষদের অবতারণা। সেখানে মহাশক্তিকে আমরা হৈমবতী রূপে পাই। এবার ভাবুন—ভারতবর্ষের শক্তি ভাবনা কত প্রাচীন! আজকের টুকরো ভারত নয়,ভাবুন বৃহত্তর ভারতবর্ষকে। সেখানে দেখবেন কত শক্তিপীঠ! শুধু প্রধান একান্ন পীঠই নয়, কত যে উপপীঠ আছেন বৃহত্তর ভারতে, তা বিস্ময়জনক। কারণ ভারতবর্ষ উপলব্ধি করেছিল একদিন মহাশক্তিরূপা বিশ্বপ্রকৃতিকে, অনুভব করেছিল সেই মহাশক্তির অদম্য শক্তিকে, শরণাগত হয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল সন্তানবৎ সেই শক্তির শ্রীচরণে।  সেই ভারত শাক্ত-ভারত। মা-মা বলে কাঁদতে সে অভ্যস্ত। জগজ্জননী সেই সন্তানকে তাঁর কোলে আশ্রয় অবশ্যই দেবেন—এ বিশ্বাস ভারতবর্ষ মনেপ্রাণে রাখে। মাতৃভাবনায় ভারতবর্ষ তাই সিদ্ধ বহুকাল আগেই। তার কণ্ঠে নিত্য ধ্বনিত হয় 'মার্কণ্ডেয় চণ্ডী'-র সেই অসাধারণ শ্লোক— "যা দেবী সর্বভূতেষু বিষ্ণুমায়েতি...

মাতৃরূপেণ—১৫, সাহিত্যে শাক্ত পদাবলীর বিশেষত্ব—অধ্যাপক সুমন ভট্টাচার্য্য

Image
  সাহিত্যে শাক্ত পদাবলীর বিশেষত্ব —সুমন ভট্টাচার্য্য (কীর্তন সম্রাট) অধ্যাপক—বিশ্বভারতী   আমাদের বাংলা অত্যন্ত গর্ববোধ করে তার একটা রত্নখনির জন্য। যদিও বাংলায় হীরের খনি নেই, চুনি-পান্নার খনি নেই, তবে কয়লার খনি আছে। রাণীগঞ্জ-আসানসোল এলাকায় গেলে মাটি খুঁড়লেই কয়লা পাওয়া যায়। কিন্তু এমন দেশও পৃথিবীতে আছে, যেখানে মাটি খুঁড়লে হীরে পাওয়া যায়। আমাদের বাংলায় সেই হিসেবে হীরের খনি নেই, তবে বড় বড় পণ্ডিত, জ্ঞানীগুণীগণ বলে গেছেন, হীরের থেকেও মূল্যবান রত্নের খনি আমাদের বাংলায় আছে। তার নাম পদাবলী সাহিত্য। এই পদাবলীর একটি সংকলন রবীন্দ্রনাথ নিজের দায়িত্বে তাঁর বন্ধু শ্রীশচন্দ্রের সঙ্গে প্রকাশ করেছিলেন। সেই পদের গ্রন্থটার তিনি নাম রেখেছিলেন—"পদরত্নাবলী"। পদাবলী সংগ্রহ নাম না রেখে রাখলেন "পদরত্নাবলী"। এক একটা পদকে তিনি রত্নের মতো মূল্যবান মনে করেছেন। তাই সেই পদরত্নাবলী আমাদের বাংলায় মূলতঃ তিন ভাগে বিভক্ত, কিন্তু একটি ভাগ এখন মানুষের চর্চার মধ্যে আর মোটেই নেই। সেটা হল "চর্যাপদ"। এটি যদিও প্রাচীনতম বাংলার নিদর্শন কিন্তু মানুষের চর্চার মধ্যে সেই পদাবলী আর নেই। কোথাও গা...

মাতৃরূপেণ—১৪, শুভঙ্করীর শুভাগমন—সৌরভ পণ্ডিত

Image
  শুভঙ্করীর শুভাগমন — সৌরভ পণ্ডিত  কাটোয়া। পূর্ব বর্ধমান। ত্বরা করি যাও গিরি আনিতে উমারে। ব্যাকুল হয়েছে প্রাণ হেরিতে মায়েরে।। দুখেতে রহিছে মেয়ে পাগলের ঘরে— অন্নপূর্ণা রূপে সদা অন্ন জুগিবারে। আছো চোখ-কান খেয়ে,উমা পাঠাইয়া। ভাবিয়া সদাই মরি, ফাটে মোর হিয়া।। লোকে বলে, পঞ্চাননে কন্যা সমর্পিয়া। বৃথাই চিন্তন তুমি করো গিরিপ্রিয়া।। মায়ের বচনে শ্যামা ব্যথিত না হও। স্নেহের সায়রে দীন সৌরভে ডুবাও।।